সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে এক প্রবাসী স্ত্রী হত্যার দায়ে জিতেশ চন্দ্র গোপ নামে এক যুবককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে লাশ গুমের চেষ্টার অপরাধে তাঁকে আরও সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে তাঁকে আরও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। এ ছাড়া হত্যা মামলায় তাঁকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সুনামগঞ্জের দায়রা জজ আদালতের বিচারক এ রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে উচ্চ আদালতের অনুমোদন বা কনফার্মেশন গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত দণ্ডিত আসামিকে ফাঁসির রজ্জুতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যাবে না; তাঁকে কনডেম সেলে রাখার নির্দেশও দিয়েছেন আদালত।
দণ্ডিত জিতেশ চন্দ্র গোপের পিতার নাম যাদব চন্দ্র গোপ এবং মাতার নাম অনিতা রাণী গোপ। তাঁর স্থায়ী ঠিকানা কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার মহিলা (শৈলা) গ্রাম। বর্তমানে তিনি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার জগন্নাথপুর বাজারের সি/এ মার্কেটে বসবাস করতেন বলে রায়ের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
আদালতের রায়ের নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৭ জানুয়ারি জগন্নাথপুর থানায় তাঁর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ও ২০১ ধারায় মামলা করা হয়। পরবর্তী সময়ে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম শেষে আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে এ দণ্ডাদেশ দেন।
যেভাবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে-
রায়ের বিবরণে বলা হয়েছে, নিহত শাহনাজ পারভীন জ্যোৎস্নার সঙ্গে জিতেশ চন্দ্র গোপের পূর্বপরিচয় ছিল। অভিযুক্ত ব্যক্তি নিহতের রক্তচাপ পরিমাপ করাসহ প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দিতেন।
২০২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নিহতের মুখে অ্যালার্জিজনিত সমস্যা দেখা দিলে তিনি এ বিষয়ে জিতেশের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং ওষুধের পরামর্শ চান।
মামলার অভিযোগ ও রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে নিহতের কাছ থেকে টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেন জিতেশ। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সকালে জিতেশ তাঁর ফার্মেসিতে গিয়ে ‘Pandura 2’ নামের ওষুধের ছয়টি ট্যাবলেট ভেঙে গোপনে রেখে দেন। একই দিন বিকেল ৩টার দিকে নিহতের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন তিনি। মুখের অ্যালার্জির ওষুধ কেনার জন্য নিহতকে তাঁর ফার্মেসিতে যেতে বলেন।
রায়ের বিবরণে আরও বলা হয়, জিতেশ নিহতের রক্তচাপ পরিমাপ করেন। পরে অন্য ক্রেতার চলে যাওয়ার পর তাঁকে ফার্মেসির পেছনে অবস্থিত একটি কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে তাঁকে নরমাল স্যালাইন ও কিছু ওষুধ দেওয়ার পর আগে থেকে ভেঙে রাখা ‘Pandura 2’ ট্যাবলেটের গুঁড়া নির্দিষ্ট পরিমাণ ‘Alargimax’ সিরাপের সঙ্গে মিশিয়ে পান করতে দেন।
ওই মিশ্রণ পান করার পর নিহত ঘুমিয়ে পড়লে জিতেশ তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে শ্বাসরোধ করেন বলে রায়ের বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। নিহত হাত-পা নেড়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করলে অভিযুক্ত তাঁর শরীরের ওপর উঠে হাঁটু দিয়ে চেপে ধরেন। একপর্যায়ে নিহতের গলায় থাকা ওড়না পেঁচিয়ে টান দিলে তাঁর মৃত্যু হয়।
লাশ গুম ও আলামত নষ্টের চেষ্টা-
রায়ের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর জিতেশ সন্ধ্যা ৭টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে একটি মন্দিরে যান। পরে রাত ১২টা থেকে সাড়ে ১২টার মধ্যে বাড়িতে ফিরে আসেন। এরপর বাড়ি থেকে একটি ছুরি ও পুরোনো লেপ নিয়ে রাত আনুমানিক ১টা থেকে ৪টার মধ্যে আবার ফার্মেসিতে যান।
ফার্মেসিতে প্রবেশের পর নিহতের মৃতদেহের পরনের পোশাক খুলে তাঁকে বিবস্ত্র করেন এবং ছুরি দিয়ে মৃতদেহের হাত, পা ও মাথা বিচ্ছিন্ন করেন বলে রায়ের বিবরণে বলা হয়েছে। পরে রক্তমাখা কাপড় দিয়ে রক্ত মুছে ফেলেন এবং ব্যবহৃত ছুরি ও অন্যান্য আলামত ফার্মেসির সিলিংয়ের ওপর রেখে দেন। এভাবে হত্যাকাণ্ডের আলামত নষ্ট এবং অপরাধের প্রমাণ গোপন করার চেষ্টা করেন বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
আদালতের আদেশ-
রায়ে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যার দায়ে জিতেশ চন্দ্র গোপকে মৃত্যুদণ্ড ও এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই আইনের ২০১ ধারায় অপরাধের প্রমাণ গোপন ও লাশ গুমের চেষ্টার দায়ে তাঁকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম অনুমোদনের জন্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দণ্ডিত আসামি হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করতে পারবেন।
এ ছাড়া রায়ের একটি অনুলিপি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, সুনামগঞ্জ; জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, সুনামগঞ্জ এবং ভারপ্রাপ্ত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, মালখানা, সুনামগঞ্জের কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।