রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’-এর আলোকে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলকে সম্পৃক্ত করতে চায় সরকারি দল। একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধনের সমালোচনা এড়াতে সরকার সর্বদলীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটির কার্যক্রমও শুরু হচ্ছে।
আগামী মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে কমিটির কার্যপরিধি, কর্মপদ্ধতি এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে। বিশেষ করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’-এর যেসব প্রস্তাব সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য, সেগুলো সংসদীয় প্রক্রিয়ায় এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সংবিধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সর্বদলীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে যেকোনো সংশোধনী নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। অতীতেও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংবিধানের কয়েকটি সংশোধনী বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়াই পাস হওয়ায় তা ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে এবং পরবর্তীতে আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
সরকারি দলের মতে, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে সংসদের মাধ্যমেই সংবিধান সংশোধনের সাংবিধানিক সুযোগ রয়েছে। তাই বিশেষ কমিটি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতামত নিয়ে একটি সংশোধনী বিল প্রস্তুত করবে।
সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিরোধী দল প্রতিনিধি না দেওয়ায় ১৭ সদস্যের পরিবর্তে ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে সংসদে জানানো হয়েছে, বিরোধী দল চাইলে যেকোনো সময় প্রতিনিধি মনোনয়ন দিয়ে কমিটিতে যোগ দিতে পারবে।
সরকারি দলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিরোধী দলকে সম্পৃক্ত করার জন্য অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত তারা কমিটিতে যোগ দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট বিশেষ কমিটিতে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে। দলটির দাবি, গণভোটে জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট অনুযায়ী সংসদীয় বিশেষ কমিটির পরিবর্তে একটি পৃথক **সংবিধান সংস্কার পরিষদ** গঠন করেই মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কার করা উচিত।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের মুখপাত্র নাজিবুর রহমান বলেন, তারা বিশেষ কমিটিতে প্রতিনিধি দেবেন না। তবে সংসদের ভেতরে ও বাইরে সংবিধান সংস্কার নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরবেন এবং সরকার জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন করে, তা পর্যবেক্ষণ করবেন।
অন্যদিকে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও বিশেষ কমিটির সদস্য মো. নূরুল ইসলাম বলেন, বিরোধী দল যেকোনো সময় প্রতিনিধি মনোনয়ন দিলেই তাদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংসদীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নের পর এ পর্যন্ত ১৭ বার সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের দাবির প্রেক্ষাপটে সংবিধান, বিচার বিভাগ, নির্বাচনব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ ১১টি খাতে সংস্কারের সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংলাপের পর ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ গৃহীত হয়, যা বাস্তবায়ন নিয়েই বর্তমানে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।