রাষ্ট্রপতির সাথে জাবি উপাচার্যের একক সাক্ষাৎ: প্রকাশ্যে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা

দে
আমির ফয়সাল
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:০১
রাষ্ট্রপতির সাথে জাবি উপাচার্যের একক সাক্ষাৎ: প্রকাশ্যে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা


২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) প্রশাসনের শীর্ষ তিন পদে—উপাচার্য এবং দুই উপ-উপাচার্য হিসেবে যথাক্রমে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জামায়াত মতাদর্শের তিন শিক্ষক দায়িত্ব পান। তবে সম্প্রতি বিএনপি সরকার গঠনের পর ভিন্ন মতাদর্শের দুই উপ-উপাচার্যকে সরিয়ে দুই বিএনপিপন্থি শিক্ষককে পদায়ন করা হয়। একই সঙ্গে ট্রেজারার পদে থাকা বিএনপিপন্থি শিক্ষক অধ্যাপক আব্দুর রবকে সরিয়ে আরেক বিএনপিপন্থি শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. সোহেল রানাকে বসানো হয়।


একই মতাদর্শের শিক্ষকদের পদায়নে প্রশাসনে ঐক্যের প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে ঘটছে বিপরীত ঘটনা। উপাচার্যের ‘একলা চল’ নীতির বিপরীতে দুই উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারারের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে একটি শক্তিশালী বলয়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মূলত ‘উপাচার্য বনাম অন্যান্য প্রশাসনিক শিক্ষক’ নীতিতে চলায় প্রশাসনিকভাবে একা হয়ে পড়েছেন উপাচার্য। ফলে প্রভাব ও শক্তি বজায় রাখতে প্রশাসনের বাইরে থাকা জাতীয়তাবাদী শিক্ষকদের সমন্বয়ে চলছেন তিনি। সম্প্রতি রেওয়াজ ভেঙ্গে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের সাথে উপাচার্যের একা সাক্ষাৎ করার বিষয়টি এ গ্রুপিং প্রকাশ্যে এনেছে। অথচ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আচার্যের সাথে সাক্ষাতকালে সে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সবাইকে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে।


সামাজিক মাধ্যমে কাদা ছোড়াছুড়ি ও পারস্পরিক ট্যাগিং

প্রশাসনের দুই ব্লকের ছত্রছায়ায় শিক্ষক, কর্মকর্তা, সাবেক ও বর্তমান ছাত্রদল এবং ছাত্রদল মনোনীত সাবেক জাকসু নেতাদের একাংশ দলীয় ও প্রশাসনিক রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। তারা নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিপক্ষকে টার্গেট করে বুলিং, সম্মানহানি এবং ‘আওয়ামীপন্থি’ বা ‘জামায়াতপন্থি’ ট্যাগিংয়ে লিপ্ত রয়েছেন।


নিজস্ব আইডির পাশাপাশি বিভিন্ন বেনামী পেজ ব্যবহার করে দুই উপ-উপাচার্য—অধ্যাপক শামছুল আলম ও অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলামকে সাবেক বিতর্কিত উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের দুর্নীতির সুবিধাভোগী হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। অভিযোগ তোলা হচ্ছে—অধ্যাপক শামছুল আলম দুর্নীতির বৈধতা দেওয়ার বিনিময়ে মেয়ের চাকরি নিয়েছেন এবং অধ্যাপক নজরুল ইসলাম দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনকালে অবরুদ্ধ অধ্যাপক ফারজানাকে নিরাপত্তা দিয়ে বের করে এনেছিলেন।


অন্যদিকে, অন্য পক্ষ থেকে উপাচার্যকে জামায়াতের ‘গোপন এজেন্ট’ ও ‘আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। তাদের দাবি, উপাচার্যের ছত্রছায়ায় ক্যাম্পাসে জামায়াতপন্থি শিক্ষকরা প্রভাবশালী হয়েছেন এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের আধিপত্য তৈরি হয়েছে।

এ ইস্যুতে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারুফ মল্লিক সামাজিক মাধ্যমে ও গত ৫ সেপ্টেম্বর এটিএন বাংলার টকশোতে উপাচার্যকে জামায়াত-শিবিরের এজেন্ট ইঙ্গিত করে বক্তব্য দেন। তিনি মন্তব্য করেন, “জাবি ভিসিকে নিয়ে কিছু বললেই জামায়াতের বট বাহিনী তার বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।” এর প্রতিবাদে ৬ সেপ্টেম্বর শাখা জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের প্যাডে একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়। তবে সেখানেও সমন্বয়হীনতা প্রকাশ পায়; ফোরামের সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শামছুল আলম পাল্টা বিবৃতিতে অভিযোগ করেন, তার সম্মতি ছাড়াই উক্ত বিবৃতিতে স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে।


নিয়োগ ও সিন্ডিকেট সদস্য পদ নিয়ে বিরোধ

বিভিন্ন নিয়োগ ও পদোন্নতি ইস্যুতেও দুই পক্ষের তীব্র মতভিন্নতা দেখা গেছে। সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি মনোনীত সিন্ডিকেট সদস্য পদায়ন নিয়ে দুই গ্রুপের অনুসারীরা সামাজিক মাধ্যম উত্তপ্ত করে তোলেন। এক পক্ষ জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জামাল উদ্দীনের বিরুদ্ধে এবং অপর পক্ষ অধ্যাপক নাহ্রিন ইসলাম খানের বিরুদ্ধে কাদা ছোড়াছুড়িতে লিপ্ত হয়। এ নিয়ে স্বাক্ষর নকল করে সাবেক ছাত্রনেতাদের নামে বিবৃতি দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।


সিন্ডিকেট সদস্য পদে সাধারণত একাডেমিক এক্সিলেন্সিরা মনোনীত হয়ে থাকেন। তবে, আলোচনায় থাকা অধ্যাপক জামাল উদ্দীনের পিএইচডি ডিগ্রী না থাকলেও উপাচার্যের গ্রুপে থাকায় তাকে মনোনীত করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করছেন অনেকেই।


এদিকে, অধ্যাপক জামাল উদ্দীনের গবেষণায় ৬২ শতাংশ এআই ব্যবহার এবং তার গবেষণা সঙ্গী সহকারী অধ্যাপক শারমিন আক্তার শিমুর নথিপত্রে জটিলতা সত্ত্বেও পদোন্নতির তদবিরের অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। এছাড়া নতুন শিক্ষক নিয়োগেও দুই পক্ষের মতপার্থক্যের খবর পাওয়া গেছে।


রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতে ঐতিহ্য ভাঙায় বিবাদ প্রকাশ্যে

দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক রেওয়াজ ভাঙায় এই বিরোধ এখন প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।


ঐতিহ্যগতভাবে আচার্য বা সরকারপ্রধানের সাথে সাক্ষাতের সময় উপ-উপাচার্যদের উপস্থিত থাকার নিয়ম রয়েছে। বর্তমানে অন্যান্য উপাচার্যরাও আচার্যের সাথে সাক্ষাতকালে এ রীতি অনুসরণ করছেন। এমনকি গত বছর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাতের সময় রাজনৈতিক ভিন্নতা সত্ত্বেও প্রশাসনিক শিক্ষকরা একত্রিত ছিলেন। তবে এবার তীব্র গ্রুপিংয়ের কারণেই এই রেওয়াজ ভেঙেছে বলে নিশ্চিত করেছেন একাধিক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক।


তাছাড়া কারো সাথে আলোচনা না করেই আগামী ২০২৭ সালের এপ্রিল মাসে সমাবর্তনের তারিখ নির্ধারণের অভিযোগ উঠেছে উপাচার্যের বিরুদ্ধে। গ্রীষ্ম মৌসুমে সমাবর্তনের এমন সিদ্ধান্তকে অপরিপক্ক হিসেবে দেখছেন অনেকে।


প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা

শিক্ষকদের একাংশের দাবি—উপাচার্য নিয়মিত অফিসে আসেন না, কেবল মিটিংয়ে যোগ দেন এবং তার অধীনস্থ অধিকাংশ কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক জানান, শীর্ষ পর্যায়ের এই গ্রুপিংয়ের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।


উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক শামছুল আলম বলছেন, “মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও আচার্য মহোদয়ের সাথে সাক্ষাৎ এবং সমাবর্তনের তারিখ নির্ধারণে সমন্বয়হীনতার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও বেশ কিছু কাজে সমন্বয়হীনতা ঘটছে। প্রশাসনে সমন্বয়হীনতার কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হুমকির মুখে পড়েছে।”


অভিযোগের বিষয়ে জানতে উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।


সর্বশেষ সংবাদ

একই বিভাগের আরও সংবাদ

🏠 হোম জাতীয় রাজনীতি আন্তর্জাতিক সারাবাংলা খেলাধুলা আইন আদালত বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি প্রবাস ধর্ম তথ্য ও প্রযুক্তি লাইফস্টাইল অপরাধ নারী ও শিশু রাজধানী অন্যান্য