হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের দাঁড়িপাল্লা

দে
আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:৫১
হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের দাঁড়িপাল্লা

কালেরবিবর্তনে ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের ওজন পরিমাপক দাঁড়িপাল্লা ও নানা ওজনের লোহার পাথর-বাটখারা। ইতিহাস মতে প্রাচীন বাংলায় মুদ্রা ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রচলিত' বিনিময় প্রথায় পণ্য দিয়ে পণ্য বদলের প্রধান মাধ্যম ছিল দাঁড়িপাল্লা।এ দাঁড়িপাল্লার সাহায্য ধান, চাল,ডাল,লবণ বা সবজি নিখুঁতভাবে মেপে লেনদেন করা হতো।


সময়ভেদে গ্রামীণ কৃষি ও বাজার অর্থনীতিতে দাঁড়িপাল্লার সাথে ৬০ ও ৮০ ওজনের লোহার সের,পোয়া','ছটাক পাথর(বাটখারার)আবির্ভাব ঘটে।পর্যায়ক্রমে এসব পরিমাপক পাথর দীর্ঘকাল টিকে থাকর পর সর্বশেষ আন্তর্জাতিক মানের কেজি'র গ্রাম-কিলোগ্রাম অন্তর্ভুক্ত হয়। আর প্রযুক্তিবিহীন যুগে গ্রামবাংলার অনাঞ্চলের ন্যায় নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে হাট-বাজারে,গ্রামীণ ব্যবসায়, মুদি দোকানে এবং গৃহস্থ পরিবারে প্রাচীনামলের দাঁড়িপাল্লা ও সময় ভেদে প্রচলিত লোহার পাথরের আনা-ছটাক,সের-মণ এবং কেজির গ্রাম-কিলোগ্রামে মাধ্যমে যাবতীয় পণ্য সামগ্রী ক্রয়-বিক্রয় করা হতো।স্বর্ণের দোকানে ছিল উমাচরণ কর্মকারের কাটা-নিক্তি ও তামা-কাসার পাথর রতি।


কিন্তু সময়ের বির্বতনে ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এর স্থান দখল করেছে ছোট-বড় ডিজিটাল ও ইলেকট্রনিক(স্কেল)মেশিন।বর্তমানে এ মেশিনের বাটন চেপে অতি সহজে ও দ্রুততার সহিত সকল ধরণের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে,স্বর্নের দোকানে,গৃহস্থ পরিবারে, ক্ষেতে-খামারে ও ভ্রাম্যমান দোকানসহ সর্বত্রই ওজন পরিমাপ করে পণ্য সামগ্রী ক্রয়-বিক্রয় করা হচ্ছে।এতে প্রাচীন বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের বাঁশ-বেতের তৈরি দাঁড়িপাল্লা এবং বিশ্ব কর্মার নিক্তি-কাটা,লোহার গ্রাম পাথর ব্যবহারের চল হারিয়ে যাচ্ছে।পরিমান মত কাঠের গোলাকার দন্ড হল দাঁড়ি। সঠিক মাপ নির্ণয়ের জন্য এ দাঁড়ির উপের একটি কাটা থাকে যা দন্ডের মাঝখানে সংযুক্ত পাট-সুতলির মোটা হাতল হল নতনি বা কাটা। বাঁশ-বেত ও টিন দিয়ে তৈরি গোলাকার পাত্রকে পাল্লা বলা হয়।এর চার কোনে পাটের রশি দাঁড়ির দু'কোণে বেঁধে ওজন পরিমাপক দাঁড়িপাল্লা তৈরি করা হয়। আর গ্রামবাংলার কারিগররা নিপুণ হাতে বাঁশের পাতি-কাঠি ও বেত দিয়ে তৈরি করতো পাল্লা ও কাঠ দিয়ে দাঁড়ি এবং তামা,লোহা পাথর বা বাটখারা। এর উপর নির্ভর করে চলতো অনেক শ্রমওজীবি কারিগরের জীবন জীবিকা। এ পেশায় রসদ খুঁজে না পাওয়ায় কিছু বেঁচে থাকা প্রবীণ কারিগরা ভিড়েছেন অন্য পেশায়। যে অত্যাবশ্যকীয় ও সনাতনী দাঁড়িপাল্লা ও নানা আকারের পাথর ছাড়া ওজন নির্ণয়ে চিন্তাই করা যেতনা,এখন দশ শতবর্ষী হাট-বাজারসহ দশ গ্রামেও চোখে মেলা ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।


কালেভদ্রে এ সনাতনী ওজন পরিমাপের দেখা মেলে উপজেলার বাহাগিলী ইউনিয়নের উত্তর দুরাকুটি কবিরাজ পাড়া গ্রামের প্রবীণ আদা ব্যবসায়ী বল্টু মামুদের বাড়িতে। তিনি আজও পুরনো ঐতিহ্যবাহী দাঁড়িপাল্লা ও নানা ওজনের পাথর ধরে রেখে ব্যবসায়ীকসহ কৃষি পণ্য সামগ্রী ক্রয়-বিক্রয় করছেন। বল্টু মামুদ বলেন,আমার মরহুম পিতা নমের উদ্দিন দাঁড়িপাল্লা দিয়ে আদার ব্যবসা করে সংসার চালাতেন।তার হাত ধরে শেখা আদার ব্যবসা ও রেখে যাওয়া স্মৃতি বিজড়িত দাঁড়িপাল্লার ঐতিহ্য হিসেবে আজও ধরে রেখেছি। বর্তমান যুগের ডিজিটাল মেশিনের বাটন চেপে স্বল্প সময়ে অধিক জিনিস পরিমাপ করা গেলেও ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক চার্জ ছাড়া চলেনা। আছে যান্ত্রিক নানা ত্রুটিও।কিন্তু হাতের সাহায্য মাপা দাঁড়িপাল্লা সময় সাপেক্ষ হলেও একটি নির্ভেজাল পরিমাপক মাধ্যম। দাঁড়িপাল্লা শুধু একটি ওজন মাপার যন্ত্র নয়,বরং এর সঙ্গে মিশে আছে বাংলার বাজার সংস্কৃতি,গ্রামীণ অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের দীর্ঘ ইতিহাস।অথচ আজ আধুনিকতার জোয়ারে গা ভাসাতে গিয়ে দীর্ঘ ইতিহাস সমৃদ্ধ সনাতনী পরিমাপক মাধ্যমগুলো কালের অতলগহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে।এতে নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছে দাঁড়িপাল্লা কেবল বইয়ের ছবি কিংবা পুরোনো দিনের গল্প হয়ে উঠছে। উত্তর দুরাকুটি পশ্চিম পাড়া গ্রামের প্রবীণ ব্যাক্তি জরিয়াল হোসেন বলেন, একসময় ক্রয়-বিক্রয় বা বিনিময় ব্যবস্থায় ছিল বিভিন্ন আকৃতির ধাতব পাত্র ও সংখ্যা গননা করে। পরে লোকায়েত জ্ঞানের দাঁড়িপাল্লা আর অনুমান করা সিল-পাথরের প্রচলন শুরু হয়।পরবর্তীতে ৬০এর ওজনের আনা,ছটাক সেরসহ বিভিন্ন লোহার পাথরের আবির্ভাব ঘটে। যা ৩০ সেরে ১ মন। এর পর ৮০ ওজনের বিভিন্ন লোহার পাথর।


যা ৪০ সেরে ১ মন।কিছু দিন আগেও ব্যবহার ছিল হাতের সাহায়্যে মাপা দাঁড়িপাল্লা ও গ্রাম-কিলোগ্রামের লোহার পাথর। যা ৪০কেজিতে ১মন। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে পর্যায়ক্রমে এসব পরিমাপক যন্ত্রের ব্যবহার ছিল লম্বা সময় ধরে।কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে ততই যেন বাঙ্গালী জীবনে এটে সেটে বসছে আধুনিকতার ধারা।এতে হারিয়ে যাচ্ছে বাঙ্গালীর হাজার বছরের লালন করা পরিমাপক সব মাধ্যম গুলো। বর্তমান প্রজন্মকে এর সাথে পরিচয় করাতে হলে যেতে হবে যাদু ঘরে।এ ঐতিহ্য রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসা দরকার। তা না হলে সৃষ্টিশীল বাঙ্গালীর আত্মপরিচয় চিরতরে হারিয়ে যাবে।অপর দিকে কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের বাজেডুমরিয়া গ্রামের প্রবীণ ব্যাক্তি আফছার আলী বলেন, দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারা শুধু পণ্য মাপার উপকরণ ছিল না, এগুলো ছিল গ্রামীণ হাটের সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের একটি অবিছেদ্য অংশ। যা একসময় সাপ্তাহিক গ্রামীণ হাট-বাজারে ঢুকলেই চোখে পড়তো হাটের অলিগলিতে ধান,চাল আটা-ময়দাসহ নানা নিত্য পণ্য সামগ্রী নিয়ে সারিবদ্ধভাবে বসে থাকা বিক্রেতাদের।


আর তাদের সামনে সাজানো থাকত দাঁড়িপাল্লা আর নানা আকারের বাটখারা। দাঁড়িপাল্লায় এসব পণ্য ওজন আর বাটখারার টুংটাং শব্দে মুখর হয়ে উঠতো পুরো হাট। সব মিলিয়ে তৈরি হতো প্রাণবন্ত এক পরিবেশ।কিন্তু কালের বিবর্তনে বদলে গেছে সেই হাটের চিত্র। গৃহস্থবাড়িতে বাড়িতেও নেই এর চল। এখন সর্বত্রই ডিজিটাল ওজন মেশিনের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে বহু কালের ঐতিহ্যবাহী দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারা। ফলে হাটের সেই পরিচিত দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারার টুংটাং শব্দ এখন স্মৃতির গল্প।উপজেলা শহরের পুরনো গালামাল ও সার ব্যবসায়ী রাজিব কুন্ড বলেন,কিছু দিন আগেও প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দাঁড়িপাল্লার ব্যবহার ছিল। এখন আর নেই। এমনকি মোদি দোকানেও দাঁড়িপাল্লার চল হারিয়ে গেছে।আধুনিক যুগে এখন সব দোকানে ডিজিটাল মেশিনে ওজন নির্ণয় করা হচ্ছে।ডিজিটাল যন্ত্রে দ্রুত ওজন করা যায় এবং হিসাবও সহজ। তাই সময় ও শ্রম বাঁচাতে আধুনিক যন্ত্রের দিকে ঝুঁকছেন সবাই। ফলে বাংলার হাট-বাজার ও গ্রামীণ অর্থনীতির সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ কেবল স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিচ্ছে। এখন শুধু পহেলা বৈশাখ বা বিশ্বকর্মার পুজোতে বের করা হয় ফুল-জল দেওয়ার জন্য। 

উপজেলা কৃষি র্কমকর্ডা লোকমান আলম বলেন,ওজনে কারচুপি রোধে ডিজিটাল মেশিনের প্রচলন বেড়েছে।ডিজিটাল মেশিনে খুব দ্রুত ও নির্ভুলভাবে ওজন মাপা যায়,যেখানে দাঁড়িপাল্লায় হিসাব করতে ও কাঁটা মেলাতে সময় বেশি লাগে। যা আধুনিকতার ছোঁয়ায় মানুষ সময় সাশ্রয়ী যন্ত্র নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় ডিজিটাল মেশিনের বাটন টিপে এক নিমিষে ভারি থেকে হালকা সব ধরনের পণ্য সামগ্রীর ওজন নির্ণয় করে কেনা-বেচা করছেন। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে বাঙালির অর্থনৈতিক ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায় জুড়ে ছিল ঐতিহ্যবাহী পরিমাপক গুলো।কিন্তু প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আজ তা প্রায় বিলুপ্ত।


সর্বশেষ সংবাদ

একই বিভাগের আরও সংবাদ

🏠 হোম জাতীয় রাজনীতি আন্তর্জাতিক সারাবাংলা খেলাধুলা আইন আদালত বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি প্রবাস ধর্ম তথ্য ও প্রযুক্তি লাইফস্টাইল অপরাধ নারী ও শিশু রাজধানী অন্যান্য