বয়সের ভার, দারিদ্র্য আর অসুস্থতার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করছেন শেরপুরের ৮০ বছর বয়সী সাজু শেখ ও তার স্ত্রী নূরজাহান বেগম। জীবনের ৬৫ বছর একসঙ্গে কাটানো এই দম্পতির সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী হলেও শেষ বয়সে এসে একে অন্যের প্রতি ভালোবাসা যেন আরও গভীর হয়েছে।
অর্থের সংকটে ঠিকমতো খাবার জোটে না, চিকিৎসার সামর্থ্যও নেই। তবুও বার্ধক্যের এই সময়ে পরস্পরকে আঁকড়ে ধরেই দিন কাটাচ্ছেন তারা।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাজু শেখের স্ত্রীকে কোলে নিয়ে খাবারের জন্য সহায়তা চাওয়ার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নজরে আসার পর তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় কয়েকটি সংগঠন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাজু শেখ ও নূরজাহানের সংসারে তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। মেয়েদের অনেক আগেই বিয়ে হয়েছে। তারা কেউ কেউ মাঝেমধ্যে বাবা-মায়ের খোঁজ নেন। তিন ছেলের মধ্যে একজন করোনাকালে নিখোঁজ হয়ে গেলেও মাঝে মধ্যে যোগাযোগ রাখেন। আরেক ছেলে ঢাকায় রিকশা চালান এবং বছরে এক-দুবার বাড়িতে আসেন। সন্তানরাও নিজ নিজ জীবনে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছেন।
বৃদ্ধ দম্পতির ছেলে নূর ইসলাম দিনমজুরি ও ঠেলাগাড়ি চালিয়ে যতটা সম্ভব বাবা-মায়ের খরচ চালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু নিজের সংসার চালাতেই তাকে হিমশিম খেতে হয়। কয়েক বছর আগে তার স্ত্রীও চিকিৎসার অভাবে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ফলে বাবা-মায়ের প্রয়োজন অনুযায়ী দেখাশোনা করা তার পক্ষেও কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রায় ছয় বছর আগে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যায় নূরজাহানের। এরপর থেকে তিনি শয্যাশায়ী। অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে পারছেন না স্বামী সাজু শেখ। ফলে অসুস্থ স্ত্রীকে ঘরেই দেখাশোনা করে যাচ্ছেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা সজীব আহমেদ বলেন, দারিদ্র্য অনেক মানুষকে জীবনের কাছে হার মানতে বাধ্য করে। তবে সাজু শেখ ও নূরজাহানের ক্ষেত্রে বার্ধক্য, অসুস্থতা ও অভাবের মধ্যেও তাদের পারস্পরিক ভালোবাসা টিকে আছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি দেখে সহযোগিতার উদ্যোগ নেন রক্তসৈনিক বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আল আমিন রাজু। তিনি জানান, বিষয়টি জানতে পেরে দ্রুত তাদের খোঁজ নেন এবং সংগঠনের পক্ষ থেকে দেড় মাসের প্রয়োজনীয় খাবার সাজু শেখের হাতে তুলে দেন।
শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি প্রশাসনের নজরে এসেছে। এরপর দম্পতির বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা বিনতে রফিক তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা করে নগদ সহায়তা দিয়েছেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, পরিবারটির বিষয়ে প্রশাসন আরও চিন্তাভাবনা করছে। তাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যেসব নাগরিক সুবিধা দেওয়া সম্ভব, সেগুলো দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।