কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। মৃত্যুর আগের রাতে তার চলাচলের কিছু দৃশ্য পাওয়া গেছে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে। তবে হোটেল এলাকা থেকে বের হওয়ার পর কোথায় গিয়েছিল তাজমিন, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত পৌনে ১২টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নূরজাহান হোটেলের সামনে কক্সবাজার থেকে আসা আইকনিক পরিবহনের একটি বাস থেকে নামে তাজমিন। এরপর সে হোটেলের পাশের খাবারের দোকান ও পশ্চিম পাশের কয়েকটি স্টেশনারি দোকানের দিকে যায়।
একপর্যায়ে একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দোকানির সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায় তাকে। এ সময় দোকানিকে কোনো কিছু দেখাতে বা দিকনির্দেশনা দিতে দেখা যায়। রাত ১২টার পর তাজমিন সেখান থেকে অন্য পাশে চলে যায়। পরে রাত সোয়া ১২টার দিকে তাকে নূরজাহান হোটেল এলাকা ছেড়ে যেতে দেখা যায়।
এরপর তাজমিন কোন পথে গিয়েছিল, কারও সঙ্গে দেখা হয়েছিল কি না কিংবা কীভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, তা জানতে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ। মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে পাওয়া একটি পরিত্যক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে ঘটনার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কসংলগ্ন লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনাস্থলের আশপাশের কয়েকটি ধানক্ষেতে ধানগাছ এলোমেলো অবস্থায় পাওয়া যায়। স্থানীয়দের ধারণা, সেখানে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তবে এসব চিহ্নের সঙ্গে তাজমিনের মৃত্যুর সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত করেননি তদন্তকারীরা।
স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন জানান, সকালে ধানক্ষেতে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পড়ে থাকার খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। সেখানে অটোরিকশা থেকে কিছু দূরে একটি ব্যাগ দেখতে পান। পরে আশপাশের ধানক্ষেতে খোঁজ করতে গিয়ে এক কিশোরীর মরদেহ দেখতে পান।
তিনি জানান, মরদেহের গলায় একটি গামছা প্যাঁচানো ছিল। পরে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
খবর পেয়ে লালমাই থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনসহ (পিবিআই) একাধিক সংস্থার সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেন।
তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম জানান, গত ৪ অক্টোবর কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হয় তার মেয়ে। প্রথমে এক বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বললেও পরে সে কক্সবাজারে যায়। বুধবার রাতে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল তাজমিন।
তিনি বলেন, বুধবার রাতে মেয়েকে একাধিকবার ফোন করেও সাড়া পাননি। রাত পৌনে দুইটার দিকে তাজমিন তাকে মোবাইল ফোনে একটি বার্তা ও নিজের অবস্থানের তথ্য পাঠিয়ে সেখানে গিয়ে নিয়ে আসতে বলে।
আবদুল আলীম বলেন, ওই সময় তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে মেয়ের পাঠানো বার্তা দেখতে পান। পরে পাঠানো অবস্থান অনুসরণ করে ঘটনাস্থলে গিয়ে জানতে পারেন, সেখানে তার মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ জানান, মেয়েটি চঞ্চল স্বভাবের ছিল। পরিবারের সদস্যদের দেখাশোনাতেও ভূমিকা রাখত সে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি জানান তিনি।
পুলিশ জানিয়েছে, তাজমিনের ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে যাতায়াতের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব সফরে তার সঙ্গে কারা ছিলেন, তা যাচাই করা হচ্ছে।
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রথমে মরদেহের পরিচয় জানা না গেলেও পরে তা শনাক্ত করা হয়। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।
কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ জানান, তাজমিনের শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। প্রাথমিকভাবে শ্বাসরোধে হত্যার সন্দেহ করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
তিনি আরও জানান, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি নিবন্ধিত। এর নিবন্ধনের তথ্য ধরে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দ্রুত রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।
নিহত জান্নাতুল তাজমিন যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামের আবদুল আলীমের মেয়ে। বাবার চাকরির কারণে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লায় বসবাস করত সে। কুমিল্লার ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল তাজমিন। তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সে বিদ্যালয়ে যাচ্ছিল না বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ময়নাতদন্ত শেষে তাজমিনের মরদেহ যশোরে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
এ ঘটনায় তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। হত্যাকাণ্ডের কারণ, তাজমিনের শেষ চলাচলের পথ এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।