দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯০৯ জনে। এর বাইরে নিশ্চিত হামে মারা গেছে আরও ১০০ জন। সব মিলিয়ে দেশে হামে ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ৯।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হামবিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার মধ্যে সর্বশেষ সাতটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন করে ১ হাজার ১৬৫ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গযুক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৪৫ জনে।
একই সময়ে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে আরও ২৯ জন। এ নিয়ে চলতি প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে দেশে নিশ্চিত হামে আক্রান্তের সংখ্যা ১৯ হাজার ৯৩৩ জনে পৌঁছেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৮ জন।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। তবে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া সাতজনের মধ্যে তিনজন ঢাকা বিভাগের। এ ছাড়া সিলেট, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে একজন করে মারা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত পরিসংখ্যানে মৃতদের বয়সভিত্তিক তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। রোগতত্ত্ববিদদের মতে, হাম যেকোনো বয়সের মানুষের হতে পারে, তবে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। প্রাদুর্ভাবের সময় হামের উপসর্গ নিয়ে যেসব মৃত্যু ঘটে, সেগুলোকে হামজনিত মৃত্যু হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, একসময় নিয়ন্ত্রণে থাকা হাম চলতি বছর ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, ২০২৫ সালে হাম প্রতিরোধে টিকাদান কার্যক্রমে অবহেলা পরিস্থিতির অবনতির অন্যতম কারণ। পাশাপাশি বর্তমান সময়ের কার্যক্রমেও বৈজ্ঞানিক তথ্য ও যথাযথ পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।
চলতি বছরের শুরুতেই দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও শুরুতে বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি বলে জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। মার্চ থেকে সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এপ্রিল ও মে মাসজুড়ে গণটিকাদান কর্মসূচি চালানো হলেও ওই সময় প্রায় ৪০ লাখ শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মাহমুদুর রহমান বলেন, দেশে এর আগে হামে এত বেশি সংক্রমণ ও মৃত্যু হয়েছে বলে তাঁর জানা নেই। তাঁর মতে, এবারের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিশুরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানের সঙ্গে আগের বছরের তথ্যের তুলনাতেও এবারের পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট। ২০২৫ সালে দেশে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত রোগী ছিল ১৩২ জন। এর আগের বছর ২০২৪ সালে ২৪৭ জন, ২০২৩ সালে ২৮২ জন এবং ২০২২ সালে ৩১১ জন আক্রান্ত হয়েছিল।
জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ বারীর মতে, চলতি বছর বিভিন্ন দেশের তুলনায় বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি হয়েছে। এত ব্যাপক সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা দেশে আগে দেখা যায়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।